জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ :
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইনডোরে সার্বক্ষণিক কোনো ডাক্তার না থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় ইনডোরে চিকিৎসক না থাকায় রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের স্টাফদের বাকবিতণ্ডায় জড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। এতে হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফ উপজেলা সরকারি হাসপাতালটি ৫০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। এখানে শিশু, মহিলা, পুরুষ, গাইনি ও সার্জারি বিভাগের পৃথক ওয়ার্ড রয়েছে। ওপিডি ও আইপিডিসহ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিভাগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন সকালে ৮-১০ জন চিকিৎসক আউটডোর তথা বহির্বিভাগে রোগী দেখেন। প্রতিদিন শিশুদেরসহ প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার রোগীকে সেবা দেওয়া হয়। বহির্বিভাগে রোগীদের প্রেসক্রিপশনের পাশাপাশি বিনামূল্যে ওষুধও সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সকাল, বিকেল ও রাতে একজন করে চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন।
হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, ইনডোরে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক না থাকায় দিনের বেলায় স্বয়ং আরএমও এবং বহির্বিভাগ থেকে ১-২ জন চিকিৎসক নিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রাউন্ড দেওয়া হয়। আর রাতের বেলায় জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসকই প্রয়োজন অনুযায়ী ইনডোরে ভর্তি রোগীদের দেখাশোনা করেন। এত বড় একটি হাসপাতালে রাতের বেলায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসক দিয়ে ইনডোরের রোগীদের সেবা দেওয়া জটিল ও কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৫০ শয্যার টেকনাফ উপজেলা হাসপাতালটি প্রায় সবসময়ই রোগীতে পরিপূর্ণ থাকে। ইনডোরে নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসক না থাকায় হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রায়ই দুর্ভোগে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন তারা। তাদের অভিযোগ, রাতের বেলায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বা নার্সরা নিয়মিত ওয়ার্ডে আসেন না। এমনকি প্রয়োজনের সময়ও তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায় না।
টেকনাফ হাসপাতালে রাতের ইনডোর সেবা নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের অনেকেই এই প্রতিবেদকের কাছে অসন্তোষ ও ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য সচেতন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টেকনাফ হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি থাকতে চান না। তাদের বেশির ভাগই রেফার নিয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে চলে যান।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি টেকনাফে রয়েছে কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প। এ কারণে টেকনাফ উপজেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি। উপজেলা হাসপাতাল হলেও টেকনাফের এ হাসপাতালটির গুরুত্ব অন্যান্য উপজেলা হাসপাতালের তুলনায় অনেক বেশি। রোগীর চাপ বিবেচনায় টেকনাফ উপজেলা হাসপাতালে সার্বক্ষণিক একজন ইনডোর চিকিৎসক প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, এখানে চিকিৎসকের ২৯টি পদ রয়েছে। বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৮ জন চিকিৎসক। আরও ১১টি পদ শূন্য রয়েছে। এমনিতেই উপজেলা হাসপাতালের ইনডোরে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকেন না। তার ওপর ১১টি পদ শূন্য থাকায় বহির্বিভাগের পাশাপাশি ইনডোরে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক রাখা কঠিন বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. এনামুল হক জানান, বর্তমান সরকার উপজেলা হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ পরিকল্পনার আলোকে দ্রুত সময়ে সরকার সারাদেশে নতুন করে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ করবে। আশা করা যাচ্ছে, খুব শিগগিরই তা বাস্তবায়ন শুরু হবে। তখন হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের সংকটও পূরণ হবে এবং ইনডোরে চিকিৎসক সংকটের সমস্যাও অনেকটা কমে আসবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ ছাবের বলেন, উপজেলা পর্যায়ে ইনডোরে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক রাখার নিয়ম এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দিনের বেলায় বহির্বিভাগের চিকিৎসকরা ইনডোরে সেবা দেন। আর রাতে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ইনডোরের রোগীদের দেখেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ বা বিশেষ প্রয়োজনে আশপাশে অবস্থানরত চিকিৎসকরাও সহযোগিতা করেন। রোগীর চাপসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে টেকনাফ উপজেলা হাসপাতালের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন বলেও জানান তিনি।
টেকনাফের সর্বস্তরের মানুষ উপজেলা হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ইনডোরে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক রাখার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
